বিনা টিকিটে - জলফড়িং - MeghPori

বিনা টিকিটে – জলফড়িং

Bina-Tickete-Meghpori-Chotogolpo-Magazine

বিনা টিকিটে – জলফড়িং

ওওওই… গেলো গেলো গেলো…

(১)

আমি স্নেহা আর আপনারা দেখছেন ‘ভারত নিউজ’। এখন বাজে সকাল দশটা, সময় সকালের “সেরা দশ খবরে” র..
— এটা কি হলো মল্লিকা এরকম খবরের মাঝে দুম করে টিভিটা বন্ধ করেদিলে!
— বাইরে সকাল থেকে মেঘ করে আছে বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে সে খবর রেখেছো?
—  তা’বলে সকাল সকাল খবর দেখাটা বাদ যাবে? এটা ক্যাবিল লাইন নয় ডিসটিভি, এমনিই বৃষ্টি শুরু হলে সব টেলিকাস্ট বন্ধ হয়ে যায়।
— সেই-তো, যতক্ষন না বাবুর সবকিছু পুরোপুরি শেষ হবে ততক্ষন থামবে না,
টিভিটা খারাপ হলে কে সারাবে এখন শুনি, সে মুরোদ কি আছে?
ছেলেটা অনেক কষ্টে একটা টিভি কিনে এনে দিয়েছে তাও টিকতে দেবে না বাপু…
মল্লিকা গজগজ করতে করতে জামাকাপড় কাচতে পুকুরে চলে যায়।
এদিকে সকাল সকাল খবর দেখতে না পেয়ে ব্যাজার মুখে বীরেনবাবু কিছুক্ষন বন্ধ টিভির দিকেই চেয়ে থাকেন। মনটা খারাপ হয়ে যায় তার আগের মতো নিজের আর সামর্থ নেই বলে নাকি টিভি বন্ধ করার কারনে তা সে নিজেও বুঝতে পারে না।
টুপ, টুপ, টাপ, টিপ…জানলার কাঁচের ওপর আওয়াজটা সুর করে বাজতে লাগলো,বৃষ্টি পড়া শুরু হয়েছে..
মাথাটা একটু তুলে ডান হাতটা বাড়িয়ে জানলাটা খুলে দিতেই এক ঝাপটা হাওয়ায় কে বা কারা যেনো হুড়মুড় করে ঢুকে পড়লো তার ফাঁকা আসবাবহীন ঘরটায়…

(২)

এই যাদের কথোপকথন এতক্ষন দেখলেন এরা হলেন আমার মা মল্লিকা মিত্র আর বাবা বীরেন মিত্র’র।
প্রথমে বাবার কথায় আসি —
— বাবার বয়স পঞ্চাশ পেরিয়েছে, প্যারালাইসিস রুগী, কোমরের নীচ থেকে আর কিছু কাজ করে না। এক সময় জুটের কারখানায় লেবারের কাজ করতেন আর এখন ঘরে বসে মায়ের সাথে ঝগড়াঝাঁটি।
তারপর মায়ের কথায় আসি—
— মা’র বয়স যখন চোদ্দো তখন বিয়ে হয়ে যায় কিন্তু এত কম বয়সে বিয়ে ভাবতেই পারেন জোর করে, তবে তা নয় মা-বাবার বিয়েটা কিন্তু পালিয়ে  মানে এখনের ভাষায় যাকে বলে লাভ-ম্যারেজ আরকি।
তারপর থেকে এই মিত্র সংসারই সবকিছু হয়ে গেছে মায়ের।
আর মায়ের কথা কি বলবো; বুঝতে পারছিনা,
মায়ের কথা কি বলা যায়?
মা তো মা’ই হয় “মা” যে সবার।
বাবা পুরোপুরি ঘরে বসে যাওয়ার পর আমিই একমাত্র রোজগেরে, কাজ সেরকম কিছু নয় বড়বাজারে কাপড়ের দোকানে মাল নামানো ওঠানোর হিসাবপত্র রাখি। সেও যদি না সোমা জোর করে কম্পিউটার শেখার ক্লাসে ভর্তি করিয়ে দিত,নাহলে হয়ত আজও পাড়ায় পাড়ায় ঘুরে খেপ খেলা ছাড়া কিছুই করে উঠতে পারতাম না।
হ্যাঁ ঠিকই ধরেছেন সোমা আর কেউ নয় আর পাঁচটা গল্পের মতোই আমার সবথেকে কাছের সবচেয়ে প্রিয় ভালোবাসার মানুষটি কিন্তু এযে গল্প নয়…

(৩)

সোমা’র সাথে আমার আলাপ, বছর এগারো আগে যখন রক্ত গরম বন্ধুদের সাথে ফূর্তির নেশায় এদিক ওদিক খেপ খেলছি।
ওদের পাড়ায় স্বর্গীয় ভোলানাথ দাস পাল ফুটবল ট্যুর্নামেন্ট খেলতে গিয়ে যখন আমাদের দল ওদের ক্লাব ঘরে ঢুকছে, তখনও খেলা শুরু হতে তিরিশ মিনিট মতো বাকি, তার আগে কিছু সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান চলছে। মাইকে একটা মেয়েলি গলার আওয়াজ শুনে ওই বয়সের আর পাঁচজন ছেলের মতোই একপলক স্টেজের দিকে তাকিয়ে ছিলাম; আর হারমোনিয়াম নিয়ে মাইক চেকিংএ ব্যস্ত বছর উনিশ-কুড়ির সোমা কে দেখেছিলাম।
লম্বা, রোগা- ফর্সা নয় গায়ের রঙ সামান্য চাপা, ঢেউখেলানো চুল বয়ে গেছে কাঁধের দুপাশ দিয়ে আর বড়ো বড়ো দুটো কালো গভীর চোখ যেন খালি সারাক্ষণ হিসাব রাখছে সমস্ত কিছুর।
কি একটা উদ্বোধনী গান গেয়েছিল যেন, মনে পড়ে না সেটা, মনে পড়ার কথাও নয় সারা গান জুড়ে আমি ওর দিকেই তাকিয়ে ছিলাম কানে কিছুই আসেনি পরে রনজয় আমায় টানতে টানতে নিয়ে গিয়ে জার্সি ধরিয়ে বলে ছিল –
— কোন আক্কেল জ্ঞান আছে তোর মেয়ে দেখার আর সময় পেলি না, কখন থেকে মাঠে নামার জন্য আমাদের টিমের নাম নিচ্ছে: আর আমরা তোকে খুঁজছি!
সেবার সেমিফাইনাল অবধি গিয়েই ফেরার বাস ধরতে হয়েছিল। কিন্তু ওই সেমিফাইনালে ম্যাচ সেরার পাঁচশো টাকার পুরষ্কার টা আমি পাই তাও আবার সোমা’র হাত থেকে, সঙ্গে একটা গোলাপ ফুলও ছিল। পরে জেনেছি সোমার পাড়ায় বেশ নাম-ডাক ছিল পড়াশোনার পাশাপাশি গায়িকা, সঞ্চালক হিসেবে যেকোন অনুষ্ঠানে উপস্থিত থেকে দায়িত্ব সামলাতো।

(৪)

খেলা সেরে ফেরার পর ফেসবুকে খুব করে খুঁজেছিলাম ওকে, পাইনি।
পরে একটা ইন্টার কলেজ ফুটবল ম্যাচে চোট পেয়ে সাইডলাইনের বাইরে যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছি, হঠাৎ ভিড়ের মধ্যে থেকে একটা হাত জলের বোতল সমেত এগিয়ে এল। তারপর যা হয়েছিল সে গল্পের মতোই।
ওখান থেকেই আলাপ,আলাপ থেকে বন্ধুত্ব তারপর শুরু প্রেম -ভালোবাসা যাই হোক না কেন;
আমার তখন কলেজে লাস্ট ইয়ার আর ও আমার দুবছরের জুনিয়র, তাও ক্যারিয়ার নিয়ে ওর যা স্পষ্ট দৃষ্টিভঙ্গি সে আমার থেকে কয়েকশো আলোকবর্ষ দুরে তো বটেই।
ওর বাড়ির অবস্থাও খুব যে ভালো তা নয়, মোটামুটি অবস্থাপন্ন বলা যায়। একটা মুদিখানা দোকান আছে ওদের, খুচরো পাইকারি ও দেয়, যা আয় ওখান থেকেই।
কলেজ শেষ হলো তারপরেও আমি খেপ খেলছি নিয়মিত। কাজ জোগাড়ের বিন্দু মাত্র ইচ্ছাও নেই। মাঝে সাঝে ওর সাথে দেখা করছি, অন্যদের মতো অত রোম্যান্টিক হয়ত সে-সব দেখা নয়।
তবে একবার আইস্ক্রিম খেয়েছিলাম আমরা একসঙ্গে। প্রত্যেকবার দেখা হলেই ওর দিকে শুধু তাকিয়ে থেকেই সময় কেটে যায় আমার,কেমন আছো কি করছো এই দুয়েকটা কথার বাইরে ও আর কথা বাড়ায় না। কাজের চেষ্টা করতে বলে বলে ও হাঁপিয়ে গেছে।
বাড়িতেও রোজ রোজ একই কথা শুনতে হচ্ছে। সোমার কাছে তাই ওর অক্সিজেন ধার নিতে আসি, সেখানেও একই কথা শুনতে ভালো লাগে না। এভাবে দু-তিন বছর কেটেছিল।

মাঝে একমাস দেখা করতে যাইনি। ওর ঠিক করে দেওয়া কম্পিউটার ক্লাসে যেতে হচ্ছে। আর এদিক ওদিক খেপ খেলছি।
দেখা করার জন্য আমাদের ঠিক করে রাখা চেনা ওই রেলস্টেশনের পাশের গলিটা যেখানে স্টেশনের থাম গুলো ওপরে উঠে গেছে তারা হয়ত একলা দাড়িয়ে আমাদের জন্যই অপেক্ষা করছে। এবার সোমার সাথে দেখা না করলেই নয়।

(৫)

সেদিন যখন বাড়ি থেকে বেরোচ্ছি ফোন এলো..

তারপর বাবাকে নিয়ে বেশ কয়েক মাস এই হসপিটাল ওই হসপিটাল করতে হলো, তারই মাঝে চাকরির খোঁজ করতে এদিক ওদিক বেরোতে হচ্ছে। বাড়িতে মা একা; বাবার ওষুধ আর আমার খাবার কোথা দিয়ে জোগান দিয়ে চলেছে আমার মাথায় ঢুকছে না।
শেষমেশ একটা কাজের জোগাড় হলো প্রথমের দিকে মাল ওঠাতে নামাতেও হতো এদোকান সে দোকান করে শেষে যে দোকানে ঢুকি সেখানে সেসব করতে হয়নি। দোকানের মালিক মাড়ওয়ারি পন্ডিত জি তাকে খুবই ভালোবাসেন নিজের বাড়ির খাবার ভাগ করে খান, কিন্তু নিয়ম একটাই দোকানের মধ্যে আমিষ আনা যাবে না।
এসবের মধ্যে বাড়ির অবস্থা একটু ঠেকানো গেছে, বাবা আর মা’র পৃথিবী এখন আমাকে কেন্দ্র করেই গড়ে উঠেছে। আমিও বেশ আছি,
বাবার জীবন খুবই সাদামাটা , কখনোই বেশি কিছুর চাহিদা নেই হয়ত নিজের চোখে দুনিয়াটাকে আমার আগে দেখেছেন বলেই।
মা, আমার মুখে একটুকরো হাসি দেখলেই খুশি হয়ে যায়।

হঠাৎ অন্ধকার হয়ে আসে চারদিক..
বৃষ্টিরা আগের থেকে ছোট হয়ে এসেছে, হাওয়ার বেগ কমে যায় জানলাগুলো যেন চেয়ে থাকে বীরেন বাবুর দিকে।
মেয়ের বায়নায় অভয় তখন স্টেশন লাগোয়া দোকান থেকে চকলেট কিনছে, হইহট্টগোলটা কানে আসতেই একটু উঁকি মেরে দেখেনিলো। ওভার ব্রিজে ওঠবার আগে শুনতে পেল –
— আরে না না বলছি তো দুর্ঘটনা নয় সুইসাইড ,না হলে ওরমভাবে কেউ হঠাৎ লাইন পারাপার করতে গিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ে!
তর্কটা চলতে থাকলো…
অভয় ভিড় এর ফাঁক দিয়ে একবার মৃতদেহটা দেখলো, চেনার কোন উপায় নেই কিছুই অবশিষ্ট রাখেনি। ঠোঁট দুটো চোখে পড়লো হঠাৎ, অদ্ভুত হাসি লেগে আছে সে ঠোঁটের কোনে। বৃষ্টির ফোটা গুলো যেন সে হাসি আরো খানিকটা বাড়িয়ে দিয়েছে।

(৬)

ঘটনাস্থল ওভার ব্রিজ থেকে হাত দশেক দুরে, সোমা ব্রিজের ওপর থেকে অভয় আর অনুকে আসতে দেখে নিশ্চিন্ত হয়।

বডিটা এখান থেকে কিছুটা দেখা যাচ্ছে কিন্তু সোমা সেদিকে তাকিয়েই মুখ ফিরিয়ে নেয়, ট্রেনগুলো দাঁড়িয়ে পড়েছে ভিড়ে থিকথিক করছে, মানুষ জনেরও বিরক্তি বেরিয়ে আসছে, কেউ বলছে —
মরার আর সময় পেলোনা এই অফিস যাবার টাইমে… কেনো যে ওই ভাঙা রেলিং টা সারায় না এরা কে জানে!
কেউবা আবার – আহারে কার ঘরের প্রদীপ নিভে গেলো জানতেও পারলো না।
সোমার এই ট্রেনগুলোর দিকে তাকিয়ে হঠাৎ মনে হলো, মানুষের জীবন ট্রেনের এক একটা বগির মতোই –
বগিগুলো যেমন ভর্তি বিভিন্ন রকমের চরিত্র বয়ে নিয়ে চলে এক একটা গন্তব্যে, তেমন মানুষের জীবনেও হঠাৎ বহু মানুষ ভিড় করে আসে আর নেমে যায় বিভিন্ন স্টেশনে। শুধু পার্থক্যটা হয়ে যায় আমাদের জীবনে সেই মানুষদের প্রবেশ মূল্য বেঁধে দেওয়া নেই বলেই বোধয় তারা এভাবে অনায়াসে হারিয়ে যায়।

গল্পে ব্যাবহৃত সমস্ত চরিত্র, স্থান কাল পাত্র কাল্পনিক, বাস্তবের সাথে কোন মিল থেকে থাকলে তা সম্পুর্ন কাকতালীয়ও অবাঞ্ছনীয়।

Please rate this Post

4.33/5 (3)

Comments are closed.